পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিরোধীদের ডিম নিক্ষেপ, হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের দাবি, তাদের শীর্ষ নেতা, সংসদ সদস্য ও বিধায়কদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব ঘটনা বন্ধে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটি দায়ের করেন আইনজীবী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। মামলায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও ডায়মন্ড হারবারের সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডেরেক ও ব্রায়েন, বিধায়ক কুণাল ঘোষ এবং মদন মিত্রের ওপর সংঘটিত বিভিন্ন হামলার ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গলবার মামলাটির শুনানি হতে পারে বলে জানা গেছে।
তৃণমূলের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকে তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালানো হচ্ছে। শুধু গ্রেফতারই নয়, আদালতে বা থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় অভিযুক্তদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, ভোটের আগে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সোনারপুরে গিয়ে হামলার মুখে পড়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। হুগলির চণ্ডীতলা এলাকায় তৃণমূলের সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে। কয়েক দিন আগে কলকাতার কালীঘাট এলাকায় দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে কুণাল ঘোষকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করা হয়।
চলতি মাসে কামারহাটিতে নিজের বিধানসভা এলাকায় হামলার শিকার হন মদন মিত্র। তার গাড়িতে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগও সামনে আসে। তৃণমূলের দাবি, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের নেতাদের জনসমক্ষে অপমান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আদালতে দাখিল করা আবেদনে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু বিরোধী মতকে দমন করতে হামলা, হেনস্তা বা ডিম নিক্ষেপের মতো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মামলায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উত্থাপন করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া তৃণমূল নেতাদের কোমরে দড়ি বেঁধে জনসমক্ষে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে এরও বিরোধিতা করা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, এ ধরনের আচরণ শুধু মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী নয়, বরং আইনের শাসনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল নেতাদের গ্রেফতারকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় আদালতে নেওয়ার পথে তাদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকে অভিযুক্তদের মাথায় হেলমেট পরিয়ে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত এখন নতুন রূপ নিচ্ছে। আগে যেখানে মিছিল, বিক্ষোভ বা পোস্টার যুদ্ধ ছিল প্রধান অস্ত্র, সেখানে এখন ব্যক্তিগত আক্রমণ ও প্রকাশ্য অপমানের অভিযোগ সামনে আসছে। এতে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
এদিকে মামলার শুনানিকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আদালত এ বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন নজরে রয়েছে। তৃণমূলের আশা, আদালতের নির্দেশে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে।
বিরোধী শিবির অবশ্য এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক নাটক বলে দাবি করছে। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং আসন্ন শুনানির ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


